IMG-LOGO
বাড়ি কলকাতা আসন বদলে কি জয় নিশ্চিত হবে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর
কলকাতা

আসন বদলে কি জয় নিশ্চিত হবে সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর

by Admin - 2021-04-19 10:23:53 1 Views 0 Comment
IMG


কলকাতা, ১৯ এপ্রিল  : শনিবার, ১৭ এপ্রিল সাতসকালেই হেলমেট পড়ে ভোটকেন্দ্রে চলে আসেন সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী। পূর্ব বর্ধমানের মন্তেশ্বরে এবার তিনি তৃণমূল প্রার্থী হয়েছেন। 

তৃণমূলনেত্রীর স্নেহের অনুব্রত মন্ডলের সঙ্গে প্রকাশ্যে লাগাতার বিরোধ প্রবীন সিদ্দিকুল্লাহকে এনে দিয়েছিল সংবাদে। গত ফেব্রুয়ারিতে তৃণমূলের একাধিক নেতা- মন্ত্রী ভোট আসতেই পর পর ছন্দপতনের দিকে যেতে শুরু করেন। আগেই 'বেসুরো' হয়ে দল পাল্টান শুভেন্দু অধিকারী থেকে রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়রা। সেই সময়ে একাধিক নেতা নেত্রী ভোটের আগে নিজের কেন্দ্রে দাঁড়ানো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করেন। সেই অসন্তুষ্টের তালিকায় নাম ছিল মঙ্গলকোট বিধানসভার সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর। তিনি ২ কোটি ৯৯ লক্ষ টাকার বিধায়ক তহবিলের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে অভিযোগ করেন, নিজের কেন্দ্রে তিনি উন্নয়নের কাজ করতে পারছেন না। এর জন্য দলের একাংশের বাধাকে তিনি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, “বীরভূম থেকে হাওয়া গরম করা হচ্ছে ৷“ শেষ পর্যন্ত তাঁর দাবি মেনে দলনেত্রী অনুব্রতর প্রভাবমুক্ত অন্য আসনে প্রার্থী করেন। 

সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চর্চা করতে গিয়ে দেখা যায়, ১৯৮৪ এবং ১৯৮৯  কংগ্রেস প্রার্থী হিসাবে কাটোয়া আসন থেকে লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নিখিল ভারতীয় সংযুক্ত গণতান্ত্রিক মোর্চার প্রার্থী হিসাবে 
বসিরহাট আসন থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাঁর দল ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ 
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে প্রাক-নির্বাচনী জোটে প্রবেশের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিল। ২০১৬ সালে মার্চে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাহাজাহান চৌধুরীকে প্রায় বারো হাজার ভোটে পরাজিত করে নির্বাচনে জয়ী হন। পরবর্তীকালে তাঁকে মন্ত্রী করে গণশিক্ষা, গ্রন্থাগার এবং সংসদীয় বিষয়গুলিতে স্বতন্ত্র দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন মন্ত্রিপরিষদের সাত মুসলমানের একজন। 

বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ধাওয়া করেছে সিদ্দিকুল্লাহকে। কখনও তিনি দাবি করেছেন, মুসলমানরা যদি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিত তবে ভারতকে স্বাধীন হতে ‘আরও ১০০ বছর’ সময় লাগত। কখনও তিনি বলেছিলেন যে ভারত যদি হিন্দু রাজ্যে পরিণত হয় তবে ভারত ভেঙে পড়বে। আবার রাজাকারদের সাথে (১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের 
সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত একটি আধা সামরিক বাহিনী) আচরণের জন্য শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের সমালোচনা করছেন। রাজাকারদের তিনি ‘ধর্মীয় নেতা’ 
হিসাবে প্রশংসা করে বলেন, ধার্মিক নাগরিকদের উপর হামলা করা বাংলাদেশ সরকারের ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। ২০১৬-র আগস্টে  সুপ্রিম কোর্ট তিন তালক নিষিদ্ধ করে। প্রতিক্রিয়ায় তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায়কে ‘অসংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে ইসলামী আইনগুলিতে হস্তক্ষেপের জন্য সমালোচনা করেন। বলেন যে এটি ইসলামের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এই আইন মেনে চলা অস্বীকার করে বলেন, মুসলমানরা শরিয়া 
অনুসরণ করবে (ইসলামিক আইন)। এই মন্তব্যের জন্য বিজেপি-র তৎকালীন জাতীয় সম্পাদক রাহুল সিনহা তাঁর গ্রেফতারের দাবি জানান। ২০১৭-র এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় সরকার যানজট এড়াতে চৌধুরী বিভিন্ন গাড়িতে একটি লাল বাতি ব্যবহার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। চৌধুরী বলেন যে তাঁর ওই বাতির অনুমতি রাজ্য সরকার তাঁকে দিয়েছিল। এর ব্যবহার বন্ধ করার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও নোটিশ পাননি। 

আদ্যান্ত সাম্প্রদায়িক ছাপপ্রাপ্ত সিদ্দিকুল্লাহ অবশ্য দাবি করেছেন ভারতে থাকতে হলে তাকে অবশ্যই ভারতীয় বিধি মেনে চলতে হবে। এই প্রসঙ্গে ‘হিন্দুস্থান সমাচার’-কে বলেন, এ ব্যাপারে আমার ভাবনাটা খুবই স্পষ্ট। আমি ভারতীয়। টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম নুর-উর রহমান বরকতি পাকিস্তানের সঙ্গে 
একটি রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। বরকতীকে তাঁর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়।

এভাবেই বছর বছর ধরে রাজ্যে সংখ্যালঘুদের মুখ হয়ে ওঠেন সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী। তৃনমূলনেত্রীও সেই সুযোগ নিয়ে তাঁকে দলের শরিক করেন। কিন্তু এবার ভোটে আইএসএফ এবং মজলিসে-ই-ইত্তেহাদুল মুসলেমিন বা এমআইএম (মিম) তাঁর সেই একাধিপত্যে ধাক্কা দিয়েছে। সিদ্দিকুল্লাহ অবশ্য সরল সত্যটা মানতে নারাজ। তিনি আব্বাস সিদ্দিকির  নাম না করে বলেন ফুরফুরা কোনও দিনই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কিন্তু ফুরফরার মাটিকে রাজনৈতিক আখড়া তৈরি করার অধিকার কারুর নেই। আব্বাসের নাম না করে তাঁর কটাক্ষ, রিমোট অন্য হাতে, তিনি পুতুল নাচ নাচছেন। বলছেন ৪০ টা প্রার্থী দেবেন। যে নিজের পুকুরে সাঁতার কাটতে পারে না, সে বলছে ইংলিশ চ্যানেল পার করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ান হবে। পাশাপাশি, মিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েসিকে আক্রমন করে তিনি বলেন, বিজেপিকে বাদ দিয়ে অন্য দলকে হারানো ওয়েসির ট্রাডিশন। বাংলায় তৃনমুলকে হারাতে চাইছেন ওয়েসি। হায়দরাবাদের উড়ন্ত পাখির দরকার নেই বাংলায়।

মন্তেশ্বরে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশি সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী। এই প্রতিবেদককে বললেন, “এখানে স্বস্তিতে প্রচার করতে পেরেছি। ভোটও ভাল হয়েছে। যদিও ২৬৮ নম্বর বুথে সিআরপি-র আচরণ নিয়ে অভিযোগ দায়ের হয়েছে রিটার্নিং অফিসারের কাছে। তবু, জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।“ ২০১১-র ভোটে সিপিএম-এর মহম্মদ হিদায়েতুল্লা মন্তেশ্বরে হারিয়ে দেন তৃণমূল প্রার্থীকে। ’১৬-র ভোটে মহম্মদ 
হিদায়েতুল্লা সামান্য ব্যবধানে হেরে যান তৃণমূলের সজল পাঁজার কাছে। গত লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-আসানসোল কেন্দ্রে (মন্তেশ্বর যার অন্তর্গত) তৃণমূল প্রার্থী সামান্য ব্যবধানে হেরে যান বিজেপি-র কাছে। এই অবস্থায় এবারের ভোটে সিপিএম-এর 
অনুপম ঘোষ চাইছেন দলের হারানো জমি উদ্ধার করতে। অন্যদিকে, বিজেপি-তে সদ্য যোগ দেওয়া সৈকত পাঁজা পেয়েছেন তাঁর বাবা সজল পাঁজার পরিচিতি। ২০১৬ সালে তাঁর বাবা তৎকালীন মন্তশ্বেরর তৃণমূল বিধায়ক সজল পাঁজার দীঘাতে মৃত্যু হয়েছিল। সৈকতের দাবি, “ঘটনা পরম্পরায় আমার মনে হয়েছে বাবার মৃত্যু রহস্যজনক।“ তাঁরাও সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর মত ভোটে জেতার ব্যাপারে আশাবাদী। মন্তেশ্বরে শেষ হাসি কে হাসেন, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ২ মে পর্যন্ত।